বগুড়ায় হরিণ খামার

বগুড়ায় হরিণ খামার

বগুড়ায় হরিণ খামার

সবুজ অরণ্যে ঘেরা বনের মধ্যে ছুটে চলা। লম্বা আর ধারালো শিং নিয়ে বাহাদুরি করা। ইচ্ছে হলেই অন্যকে আঘাত করার চেষ্টা। বনের নীরবতায় নিজেদের আনন্দে ছুটে চলা। এ প্রাণীটির নাম হরিণ। কিন্তু এখন শব্দ পেলেই হরিণগুলো ছুটে যাচ্ছে ঘরের মধ্যে। হরিণগুলো এখন ভুসি, লতাপাতা, ঘাস খাচ্ছে। খাচ্ছে আর নির্ধারিত ঘরের মধ্যে লাফালাফি করছে। একে অপরের সঙ্গে মারামারিও করছে। আবার সময়ে সময়ে প্রেমেও মজে যাচ্ছে। বছরে দুবার বাচ্চাও দিচ্ছে। বগুড়ার শিবগঞ্জের সিহালীহাট এলাকার চাতাল ব্যবসায়ী আলহাজমোখলেসুর রহমানের ব্যক্তিগতভাবে গড়ে তোলা চিত্রা হরিণ খামারে গিয়ে এসব চিত্র দেখা যায়। জানা যায়, শহর থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দূরে শিবগঞ্জ উপজেলার পীরব ইউনিয়নের সিহালী গ্রাম। সিহালীর মোখলেছুর রহমানের চাতালের এক পাশে গড়ে তোলা হয়েছে হরিণ খামার। শখের বসে দুই হরিণ পালন করতে গিয়ে বড় হতে থাকলে গড়ে তুলেছেন খামার। নিয়ম মেনে খামার গড়ে এখন হরিণ বিক্রি করার পর তার খামারে আছে ১২টি হরিণ। প্রায় ২০ বছর ধরে ধীরে ধীরে হরিণ খামারে হরিণের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা পার্ক, পিকনিক স্পটের জন্য হরিণগুলো কেনা হচ্ছে।

হরিণ খামারি মোখলেছুর রহমানের পরিবারের সদস্যরা জানান, ছোটবেলা থেকেই মোখলেছুরের হরিণ, উট ও দুম্বা পালনের ইচ্ছা ছিল। সেই ইচ্ছা পূরণে ২০০৩ সালে রাজশাহী চিড়িয়াখানা থেকে দুই বছর বয়সী একজোড়া চিত্রা হরিণ কিনে নিয়ে পোষ মানাতে থাকেন। হরিণ ক্রয়ের আগে রাজশাহীর বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কাছে সনদপত্র গ্রহণ করেন। হরিণ রাখার জন্য আলাদা করে একটি ঘর করেছেন। সামনে ফাঁকা জায়গা রাখা হয়েছে। যেন হরিণগুলো আলো-বাতাসে আসতে পারে। ফাঁকা জায়গাটি ঘিরে দেওয়া হয়েছে। ঘেরার মধ্যে এখন চিত্রা প্রজাতির পুরুষ ও নারী হরিণ রয়েছে। হরিণ খামারের দেখভালের কর্মীরা জানান, হরিণগুলো বছরে দুবার বাচ্চা দেয়। জন্মের পর বাচ্চার গায়ে হাত দিলে হরিণ সে বাচ্চাকে সহজে দুধ দেয় না। হরিণ পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করে।

হরিণগুলোর মধ্যে নারী ও পুরুষ হরিণ আছে। এ খামারের সব হরিণই চিত্রা হরিণ। ছয় মাস পর একটি হরিণের ওজন হয়ে থাকে প্রায় ২০ কেজির বেশি। সিহালীর বাসিন্দা মাসুদ রানা জানান, এ এলাকায় হরিণের খামার আছে দীর্ঘদিন ধরেই। হরিণ দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন আসে। হরিণ পালতে হলে লাইসেন্স করতে হয়। লাইসেন্স খরচও অনেক। সে কারণে ইচ্ছা থাকলেও পালন করা যাচ্ছে না। হরিণ খামারি হাজি মোখলেসুর রহমান জানান, তার হরিণ, উট ও দুম্বা পালার ইচ্ছা ছিল। এরপর শখের বসে শুরু করেন। এখন একটি খামার হয়েছে। হরিণ বিক্রি করে বাড়তি আয় হয়ে থাকে। ২০০৩ সালে রাজশাহীর বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ থেকে লাইসেন্স গ্রহণ করেন। এরপর রাজশাহী চিড়িয়াখানা থেকে প্রায় ৪০ হাজার টাকায় চিত্রা প্রজাতির একটি পুরুষ ও একটি নারী হরিণ ক্রয় করে লালন-পালন শুরু করেন। দেড় বছর পর থেকে একটি করে বাচ্চা প্রসব শুরু করে। বন বিভাগের অনুমতিতে ১৫ বছরে কয়েকটি জেলায় বেশ কয়েক জোড়া হরিণ বিক্রি করেছেন। প্রথম দিকে ৫০ হাজার টাকা জোড়া বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা জোড়া। খাবার হিসেবে তেমন খরচ নেই। গরুর চেয়ে খাবার খরচ কম। হরিণগুলো ঘাস, ভুসি, কাঁঠাল পাতা, কলা, চালের গুঁড়া কলাগাছ, পাকুর বৃক্ষের পাতা, ধানও খায়। ২০ দিন আগে একটি বাচ্চা দিয়েছে। একটি হরিণ একটি করে বাচ্চা দিয়ে থাকে। হরিণ নিজে থেকেই পরিষ্কার থাকে বলে তাদের রোগবালাই কম।

প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা হরিণগুলোর চিকিৎসার খোঁজ নিয়ে থাকেন। হরিণ পালন কিছুটা সহজ হলেও এর লাইসেন্স পাওয়া কঠিন। তার দেখাদেখি হরিণ পালনে অনেকেই আগ্রহী হলেও লাইসেন্স না থাকায় সেটা করতে পারছেন না। মোখলেছুর রহমান জানান, হরিণ পালনের ফি, লাইসেন্স নবায়ন ফি কমাতে হবে। তাহলে হরিণ খামার গড়ে উঠবে আরও বেশি। তিনি আগামীতে হরিণের পাশাপাশি উট ও দুম্বার খামার গড়ে তুলতে চান। প্রতি বছর দেশ থেকেই হরিণ, দুম্বা ও উটের সরবরাহ বৃদ্ধি করতে বেসরকারি বা ব্যক্তি উদ্যোগকে সহজ করে নিয়ে আসতে হবে। শ্রমিকদের কাজ বাড়বে। আর্থিকগতিও বাড়বে। পীরব ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সফিকুল ইসলাম সফিক জানান, হরিণ খামার দেখতে মাঝে মাঝে বিভিন্ন এলাকা থেকে উৎসুক জনতা আসেন। সামাজিক বন বিভাগ বগুড়ার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মুহম্মদ সুবদোর ইসলাম জানান, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী হরিণ পালন বা খামার করা যাবে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, চিত্রা হরিণের খামার আছে বগুড়ায়। কোনো প্রয়োজন হলে কর্মকর্তারা সহযোগিতা করে থাকেন।

সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন